দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাংকে সাইবার হামলায় AI ব্যবহারের সন্দেহ, তদন্তে নতুন তথ্য

একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনা তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ; AI-নির্ভর সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্কতা জোরদার
নিজস্ব প্রতিবেদক | আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি
দক্ষিণ কোরিয়ার একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক সাইবার হামলার ঘটনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের সন্দেহ দেখা দিয়েছে। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের এসব ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৬ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি হ্যাকিংয়ের ঘটনায় AI ব্যবহারের লক্ষণ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে দ্রুত ও স্পষ্ট তদন্তের পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদ কাজে লাগানোর নির্দেশ দেন তিনি। তবে হামলায় ঠিক কোন AI প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, সে বিষয়ে তখনও পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
একাধিক ব্যাংকের গ্রাহকদের তথ্য ফাঁস
রয়টার্সের ৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিনহান ব্যাংক, কেবি কুকমিন ব্যাংকসহ দক্ষিণ কোরিয়ার একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলার ঘটনা সামনে এসেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হানা ব্যাংক ও উরি ব্যাংকেও তথ্য নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।
৮ অক্টোবর প্রকাশিত আরেকটি রয়টার্স প্রতিবেদনে মার্কিন সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্রাউডস্ট্রাইকের বরাতে বলা হয়, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের শুরুর মধ্যে অন্তত নয়টি দক্ষিণ কোরীয় ব্যাংককে লক্ষ্য করে হামলার তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিনহান ব্যাংকের প্রায় ২৫ হাজার গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ব্যাংকটি জানিয়েছে। কেবি কুকমিন ব্যাংকও ১১৯ জন গ্রাহকের তথ্য ফাঁসের কথা জানিয়েছে। এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ পরিধি নির্ধারণে তদন্ত চলছে।
হামলায় AI টুল ব্যবহারের অভিযোগ
ক্রাউডস্ট্রাইকের তদন্তে সন্দেহভাজন একজন ব্যক্তি চীনের গুয়াংডং প্রদেশে অবস্থান করতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি ARTEX নামের একটি চীনা-উন্নত AI-সহায়ক পেনিট্রেশন টেস্টিং টুল এবং Anthropic-এর Claude-সংক্রান্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারেন।
ARTEX একটি ওপেন-সোর্স টুল, যা নেটওয়ার্কের দুর্বলতা পরীক্ষা করার কাজে তৈরি। এটি নিজে কোনো স্বতন্ত্র বৃহৎ ভাষা মডেল নয়; বরং বাইরের AI মডেলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে। এর অপব্যবহার করে বাস্তব সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশের চেষ্টা করা সম্ভব বলে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে ক্রাউডস্ট্রাইকের এই মূল্যায়ন তদন্তের একটি অংশ। সন্দেহভাজন ব্যক্তির পরিচয় ও হামলার সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা স্বাধীনভাবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। চীনা কর্তৃপক্ষও হ্যাকিং কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদারে জরুরি পদক্ষেপ
দক্ষিণ কোরিয়ার আর্থিক কর্তৃপক্ষ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছে। আর্থিক নিরাপত্তা তদারকি সংস্থা সংশ্লিষ্ট খাতে সন্দেহজনক কার্যক্রমের তথ্য ভাগাভাগি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে।
তদন্তকারীদের প্রধান কাজ হচ্ছে কীভাবে গ্রাহকদের তথ্যে অননুমোদিত প্রবেশ ঘটেছে, কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এবং হামলাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা।
AI প্রযুক্তির নতুন ঝুঁকি
AI এখন সফটওয়্যার তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ ও নিরাপত্তা পরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে একই প্রযুক্তি অপব্যবহার করে দুর্বলতা খুঁজে বের করা বা সাইবার হামলার কিছু ধাপ দ্রুত করার ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে শুধু প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে AI-সহায়ক নজরদারি, দ্রুত হুমকি শনাক্তকরণ এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের সঙ্গে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের ফল প্রকাশের পর হামলার প্রকৃত ধরন ও AI-এর ভূমিকা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।



