অক্সফোর্ডের জীবন থেকে ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চ, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পেরিয়ে কারাগার—ইমরান খানের বর্ণিল জীবন

ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চ থেকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে কারাবন্দিত্বে ইমরান খানের বর্ণিল জীবনের নানা অধ্যায়
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | BNBD365 NEWS
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অক্সফোর্ডের জীবন থেকে ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চ, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পেরিয়ে কারাগার—ইমরান খানের বর্ণিল জীবন
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ক্রিকেট বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খানের জীবন যেন নানা বাঁকে পরিবর্তিত হওয়া এক দীর্ঘ গল্প। উচ্চবিত্ত পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা, ইংল্যান্ডে পড়াশোনা, ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক খ্যাতি, ব্যক্তিজীবন নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা, এরপর রাজনীতিতে প্রবেশ এবং শেষ পর্যন্ত দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব—তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই আলাদা করে আলোচিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কারাবন্দিত্বের কারণে আবারও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় রয়েছেন ইমরান খান। তার দীর্ঘ জীবনের বিভিন্ন পর্যায় ফিরে দেখলে একজন ক্রিকেট তারকার রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে আসার পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনে বড় ধরনের পরিবর্তনের চিত্রও দেখা যায়।
অক্সফোর্ডে পড়াশোনা
ইমরান খান পাকিস্তানের একটি অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার তারুণ্যের উল্লেখযোগ্য সময় কাটে ইংল্যান্ডে। সেখানে তিনি অক্সফোর্ডের কেবল কলেজে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৭৫ সালে পড়াশোনা শেষ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষে লন্ডনের সামাজিক পরিমণ্ডলেও তার উপস্থিতি আলোচিত হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে সে সময়ের অভিজাত সামাজিক পরিবেশ, নাইটক্লাব এবং বিভিন্ন তারকা ও মডেলের সঙ্গে ওঠাবসার কারণে আলোচনায় থাকা একজন তারকা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। ফলে ক্রিকেটার হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার আগেই তার ব্যক্তিজীবনও সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে।
ক্রিকেটেই গড়ে ওঠে বিশ্বখ্যাতি
তবে ইমরান খানের সবচেয়ে বড় পরিচিতি আসে ক্রিকেট থেকে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারে তিনি পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অলরাউন্ডার ও অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তার নেতৃত্বের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় আসে ১৯৯২ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে। ইমরান খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপের শিরোপা জয় করে। সেই সাফল্যের পর তিনি পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধিনায়কে পরিণত হন।
ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর তার জীবনে আসে নতুন অধ্যায়।
ব্যক্তিজীবনে পরিবর্তন
১৯৯৫ সালে ইমরান খান বিয়ে করেন ব্রিটিশ ধনকুবের পরিবারের সদস্য জেমিমা গোল্ডস্মিথকে। তাদের দাম্পত্য জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; ২০০৪ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়।
এরপর সময়ের সঙ্গে ইমরান খানের ব্যক্তিজীবন ও চিন্তাভাবনায় পরিবর্তনের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। তিনি আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং পরবর্তীতে বুশরা বিবিকে বিয়ে করেন। তার এই পরিবর্তনকে অনেকে ক্রিকেটজীবনের সময়কার আলোচিত জীবনধারার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
১৯৯৬ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ
ক্রিকেটের মাঠ ছাড়ার পর ইমরান খান সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই।
রাজনীতির শুরুতে দলটি বড় ধরনের নির্বাচনী সাফল্য না পেলেও ইমরান খান দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যান। ধীরে ধীরে পাকিস্তানের তরুণ ও শহুরে ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে তার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।
প্রায় দুই দশকের রাজনৈতিক প্রচেষ্টার পর ২০১৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে পিটিআই সরকার গঠন করে এবং ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন অধ্যায়
ক্রিকেটের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী—ইমরান খানের এই উত্থান পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি দুর্নীতি দমন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতো বিভিন্ন বিষয় সামনে আনেন। একই সঙ্গে তার রাজনৈতিক বক্তব্য ও ইসলামভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা নিয়েও দেশ-বিদেশে আলোচনা হয়।
তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সময়কাল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
ক্ষমতা হারানো ও কারাবন্দিত্ব
রাজনৈতিক বিরোধ, সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা এবং বিভিন্ন মামলাকে ঘিরে ইমরান খানের রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ হারান।
ক্ষমতা হারানোর পর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও অভিযোগ সামনে আসে। এসব মামলার কিছুতে তাকে দণ্ডিত করা হয় এবং তাকে কারাগারে যেতে হয়।
ইমরান খান ও তার দল এসব আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। তার রাজনৈতিক সমর্থকদের একটি অংশও এসব মামলাকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও মামলার প্রক্রিয়ায় আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে এসেছে।
ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক—এক দীর্ঘ রূপান্তর
ইমরান খানের জীবনের দিকে তাকালে কয়েকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয় এক ব্যক্তির মধ্যেই দেখা যায়। অক্সফোর্ডের শিক্ষার্থী থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তারকা, বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক থেকে রাজনীতিক এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী—প্রতিটি পর্যায়েই তিনি ব্যাপক জনআগ্রহের কেন্দ্রে ছিলেন।
তার জীবনের শেষ কয়েক বছরের রাজনৈতিক ও আইনি ঘটনাপ্রবাহ সেই আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করেছে। ফলে ইমরান খানের জীবন শুধু পাকিস্তানের ক্রিকেট বা রাজনীতির ইতিহাসের অংশ নয়; দক্ষিণ এশিয়ার সমকালীন রাজনীতিতে একজন ক্রীড়া তারকার রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে আসার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হয়।
ব্রেকিং নিউজ বিডি
সব খবর সবার আগে


