১৮ দিনে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ৩ জাহাজে ডাকাতি, ১০ কোটি টাকার পন্য সামগ্রী লুট

১৮ দিনে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ৩ জাহাজে ডাকাতি, লুট ১০ কোটি টাকার পন্য
বন্দর প্রতিনিধি:BNBD NEWS
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জলদস্যুদের তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। মাত্র ১৮ দিনের মধ্যে তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার মালামাল ও যন্ত্রপাতি লুট করে নেয় তারা। এতে বন্দর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন আমদানিকারকরাও। ইতোমধ্যে ঘটনাগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরপর তিনটি ডাকাতির ঘটনা
২৯ জুন চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা
‘এমভি হাই জু’ জাহাজে ২০-২৫ জন সশস্ত্র ডাকাত দলবদ্ধভাবে উঠে নাবিকদের জিম্মি করে প্রায় ১ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ লুট করে নিয়ে যায়। জাহাজটি ডায়নামিক শিপ রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠান আমদানি করেছিল।
৩০ জুন পরদিনই যমুনা শিপ ব্রেকার্সের আমদানি করা ‘এমটি আইআরওএস’ জাহাজ থেকে কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জাম চুরি হয়। পরে নৌ পুলিশ রাজধানীর বাংলাবাজার থেকে প্রায় ২ কোটি টাকার চোরাই মালামাল উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
১৬ জুলাই ভোরের অন্ধকারে সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার ‘তাই শুয়েন’-এ হামলা চালায় প্রায় ২০ জন সশস্ত্র জলদস্যু। তারা ৫টি কাঠের নৌকায় এসে জাহাজে উঠে পড়ে। হংকং থেকে সীতাকুণ্ডের জনতা স্টিলের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য আনা এই জাহাজ থেকে তারা নোঙরের দড়ি, ব্যাটারি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করে।
শিপিং এজেন্ট বেন লাইনের মালিক মোশাররফ হোসেন জানান, ডাকাতদল দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে একদল নাবিকদের ব্যস্ত রাখে, অন্যদল ডেক থেকে সরঞ্জাম লুট করে। জাহাজের ক্যাপ্টেন তাৎক্ষণিক বন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে রেডিওতে সংবাদ পাঠালেও কোস্টগার্ড পৌঁছানোর আগেই ডাকাতরা পালিয়ে যায়।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ পণ্য পরিবহিত হয়। বিশেষ করে বন্দরে আসা পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ খালাস করা হয় বহির্নোঙরেই—কারণ নাব্য সংকটে বড় জাহাজগুলো সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারে না। প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০টি বড় পণ্যবাহী জাহাজ বহির্নোঙরে নোঙর করে থাকে, যেখান থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় দেড় লাখ টন পণ্য খালাস করা হয়।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে—
· জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে
· আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত হবে
· বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে
· বিদেশি শিপিং অপারেটরদের মধ্যে ঝুঁকি আশঙ্কা বাড়বে
· বীমা ব্যয় ও বৈদেশিক বাণিজ্যের খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে
শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর ও বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংস্থা তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ বার্থ অপারেটর অ্যান্ড শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সরওয়ার হোসেন বলেন, “চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। হঠাৎ করেই বহির্নোঙরে এ ধরনের ডাকাতি শুরু হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, “ছোট নৌকায় করে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে ডাকাতরা বড় জাহাজে চড়াও হয়। এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
শিপিং এজেন্ট বেন লাইনের মালিক মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেন, প্রতিটি ঘটনায় কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোস্টগার্ড সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) এবং বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের জোনাল কমান্ডারকে নিয়ে জরুরি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো হলো:
· কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে বহির্নোঙরে নজরদারি বাড়ানো
· অনুমোদিত ওয়াচম্যান নিয়োগ নিশ্চিত করা
· জাহাজের আগমনের তথ্য বাধ্যতামূলক সরবরাহ নিশ্চিত করা
· প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা
· কোস্টগার্ডের টানা অভিযান অব্যাহত রাখা
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামীম জানান, নিরাপত্তাব্যবস্থা ইতোমধ্যেই কঠোর করা হয়েছে এবং ডাকাতির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে জরুরি চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে তাৎক্ষণিক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, জলদস্যুতার কারণে অন্তত ১০ কোটি টাকার মালামাল লুট হয়েছে এবং জাহাজের নিরাপত্তা ও নাবিকদের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিজিওনাল কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট অন কমবেটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রোবেরি এগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া (রিক্যাপ) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি-এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু জুনের শেষ থেকে শুরু হওয়া এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।



