২০৩২ সালে নতুন মেট্রোরেল, ঢাকায় বাড়ছে দ্রুত গণপরিবহনের নেটওয়ার্ক

রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন মাত্রা আনতে এমআরটি-১, এমআরটি-৫ উত্তর ও দক্ষিণ রুটে বড় বিনিয়োগ; তিন প্রকল্পে ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা
BNBD365 NEWS | নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকার ক্রমবর্ধমান যানজট ও গণপরিবহনের চাপ সামাল দিতে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মেট্রোরেল-১, মেট্রোরেল-৫ (উত্তর) এবং মেট্রোরেল-৫ (দক্ষিণ)—এই তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মেট্রোরেল-৫ (উত্তর) ২০৩২ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে মেট্রোরেল-১ ও মেট্রোরেল-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পের কাজ শেষ করার সময়সীমা ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ধরা হয়েছে।
তিন মেট্রোরেলে ব্যয় প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা
বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে মেট্রোরেল-১ এবং মেট্রোরেল-৫ (উত্তর) প্রকল্পের সংশোধিত সম্মিলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
অন্যদিকে নতুন প্রকল্প হিসেবে মেট্রোরেল-৫ (দক্ষিণ) বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে তিন প্রকল্পে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় নগরায়ণ এবং যাত্রীচাহিদা বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতে আরও মেট্রোরেল নির্মাণের সুযোগ রাখা হচ্ছে।
বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর যাবে মেট্রোরেল-১
দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল হিসেবে পরিকল্পিত এমআরটি লাইন-১ বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি ২০১৯ সালে অনুমোদিত হলেও নানা জটিলতার কারণে আগের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। সংশোধিত হিসাবে এখন এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রকল্পে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার ঋণসহ সরকারের অর্থায়ন থাকবে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮ লাখ যাত্রী এই রুট ব্যবহার করতে পারেন।
এমআরটি-১-এ মোট ২১টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর বড় একটি অংশ হবে পাতালপথে। নির্মাণকাজের সময় রাজধানীর সড়কে যানজট কমাতে প্রায় ২০ কিলোমিটার বিকল্প সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও প্রকল্পের আওতায় রাখা হয়েছে।
২০৩২ সালে চালুর লক্ষ্য এমআরটি-৫ উত্তর
হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি-৫ (উত্তর) প্রকল্পের ব্যয়ও সংশোধন করা হয়েছে। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
রুটটির প্রায় ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার হবে পাতালপথ এবং ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার উড়ালপথ। মোট ১৪টি স্টেশনের মধ্যে ৯টি পাতাল এবং ৫টি উড়াল স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আগে প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য ছিল। সংশোধিত পরিকল্পনায় সময় বাড়িয়ে ২০৩২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই রুট দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ লাখ ৩০ হাজার যাত্রী চলাচল করতে পারেন। প্রকল্পে জাপানের ঋণ ও সরকারের অর্থায়ন রয়েছে।
গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি হবে এমআরটি-৫ দক্ষিণ
নতুন করে নেওয়া এমআরটি-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পের রুট হবে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়নের পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়ন থাকবে।
রুটটির প্রায় ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতাল এবং ৪ দশমিক ১৫ কিলোমিটার উড়ালপথ। মোট ১৫টি স্টেশনের মধ্যে ১১টি পাতাল ও ৪টি উড়াল স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত। প্রাথমিক হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী এই রুট ব্যবহার করতে পারেন।
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন
মেট্রোরেল রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করলেও প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে জাপানের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর নির্মাণব্যয়, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান যুগান্তরকে দেওয়া বক্তব্যে মেট্রোরেল প্রকল্পের দরপত্র ও নির্মাণপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট প্রযুক্তি ও নির্মাণপদ্ধতির ওপর নির্ভরতা ঠিকাদার নির্বাচনের সুযোগ সীমিত করতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন অর্থায়ন চুক্তির আওতায় বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও ঠিকাদার নির্বাচনের প্রক্রিয়া তুলনা করে দেখা প্রয়োজন।
পাতাল মেট্রোরেলের পরিচালন ব্যয়ও বড় বিষয়
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় শুধু নির্মাণব্যয় নয়, ভবিষ্যতে পাতাল মেট্রোরেল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ের বিষয়টিও উঠে এসেছে। পাতাল রেলব্যবস্থায় আলো, বায়ু চলাচল, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক সরঞ্জামসহ বিভিন্ন অবকাঠামো সার্বক্ষণিক সচল রাখতে হয়। ফলে নির্মাণের পর নিয়মিত পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজধানীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নগরায়ণের কারণে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। মেট্রোরেলকে দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ধীরে ধীরে মেট্রোরেলনির্ভর নগরীতে ঢাকা
বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার মেট্রোরেল চালু রয়েছে। নতুন তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩২ সালে এমআরটি-৫ (উত্তর) চালুর পর ২০৩৩ সালের মধ্যে এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গণপরিবহন কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
ব্রেকিং নিউজ বিডি
সব খবর সবার আগে



