মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি:বিশ্বব্যাংক

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি
নিজস্ব প্রতিবেদক | অর্থনীতি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের একটি মূল্যায়নে এসব ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। সরকারের বাজেট সহায়তার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে ওই মূল্যায়ন করা হয়।
জ্বালানি সংকটে বাড়ছে চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে পড়তে শুরু করেছে। দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি গ্যাসনির্ভর হলেও ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় বর্তমানে গ্যাস উৎপাদন প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে।
এদিকে বাংলাদেশ যে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি আমদানি করে, তার বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে।
বিশ্ববাজারে স্পট এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠে গেছে, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের আশঙ্কা
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, জ্বালানির বাড়তি দাম ধাপে ধাপে ভোক্তাদের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালেই বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত না থাকলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু সংঘাতের কারণে সেই সংখ্যা প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা ব্যাহত হতে পারে।
কৃষিতেও বাড়ছে ঝুঁকি
জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতেও। দেশে সার উৎপাদনের জন্য গ্যাসের প্রয়োজন হলেও কয়েকটি ইউরিয়া কারখানায় গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।
ইতোমধ্যে ইউরিয়ার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম আরও বাড়তে পারে, এমনকি দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কাও জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা।
স্বাস্থ্য খাতেও বাড়বে ব্যয়
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে স্বাস্থ্য খাতেও ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়, ফলে পরিচালন ব্যয় বাড়ে।
এ ছাড়া দেশের ওষুধ শিল্পের বড় অংশের কাঁচামাল এবং হাসপাতালের অধিকাংশ সরঞ্জাম আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হলে পরিবহন ও আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।
কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে কর্মসংস্থানে দেখা দিতে শুরু করেছে।
তিনি জানান, নতুন করে অনেক শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও কাজের সময় কমানো হয়েছে, আবার জ্বালানি সংকটের কারণে কিছু কারখানা বন্ধও হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কা তাই বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংকট দীর্ঘ হলে কী হতে পারে?
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের ওপর একসঙ্গে কয়েকটি চাপ তৈরি হতে পারে—জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান সংকোচন, কৃষি ব্যয় বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বাড়ার ঝুঁকি।
বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট বক্তব্য

