জমির নামজারিতে বড় পরিবর্তন, উত্তরাধিকারীদের জন্য নতুন নিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশে জমির মালিকানা সংক্রান্ত সরকারি রেকর্ড হালনাগাদের প্রক্রিয়া নামজারি বা মিউটেশনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়মে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি ভাগ-বাটোয়ারা না হলে সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে যৌথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তিত নির্দেশনা অনুযায়ী, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে শুধু একজন বা কয়েকজন ওয়ারিশের নামে আলাদাভাবে নামজারি করার সুযোগ থাকবে না। মৃত ব্যক্তির সব বৈধ ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
যৌথ নামজারিতে বণ্টননামা লাগবে না
নতুন নিয়মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করতে কোনো নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন হবে না।
এক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করা যাবে। খতিয়ানে প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য অংশ বা হিস্যাও উল্লেখ থাকবে।
তবে ওয়ারিশরা যদি জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে প্রত্যেকের নামে আলাদা খতিয়ান করতে চান, তাহলে নিবন্ধিত আপস-বণ্টননামা বা বণ্টননামা দলিল থাকতে হবে।
অর্থাৎ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে এখন মূলত দুটি ব্যবস্থা থাকছে—
– যৌথ নামজারি: সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে থাকবে।
– পৃথক নামজারি: নিবন্ধিত বণ্টননামার ভিত্তিতে প্রত্যেকে আলাদা খতিয়ান করতে পারবেন।
একজন ওয়ারিশের নামে সব জমি করার সুযোগ কমবে
আগে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যেত, উত্তরাধিকারীদের মধ্যে একজন বা কয়েকজন অন্যদের বাদ দিয়ে নিজের নামে জমির নামজারি করে নিতেন। নতুন নিয়মে সব ওয়ারিশের তথ্য একসঙ্গে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।
নামজারির আবেদনের সঙ্গে সব ওয়ারিশের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। কোনো বৈধ ওয়ারিশকে বাদ দেওয়া হলে আবেদন নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারির আবেদন বাতিল করা যাবে না—নতুন নির্দেশনায় বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
নামজারি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জমি কেনা বা উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা পাওয়ার পর শুধু দলিল রেজিস্ট্রি করলেই প্রক্রিয়া শেষ হয় না। সরকারি রেকর্ড বা খতিয়ানে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পুরোনো মালিকের পরিবর্তে নতুন মালিকের নাম সরকারি রেকর্ডে যুক্ত করার প্রক্রিয়াই নামজারি বা মিউটেশন।
নামজারি না থাকলে জমির মালিকানা নিয়ে ভবিষ্যতে বিরোধ তৈরি হতে পারে। অন্য ওয়ারিশ বা কোনো দখলদার জমির ওপর দাবি তোলার সুযোগ পেতে পারে।
নিজ নামে খতিয়ান না থাকলে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়তে পারেন জমির মালিক।
আগে নামজারি করা থাকলে আবার করতে হবে?
নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগে কারও নামজারি হয়ে থাকলে সাধারণভাবে তাকে আবার নতুন করে নামজারি করতে হবে না। পুরোনো খতিয়ানে তথ্য সঠিক থাকলে সেটিই বহাল থাকবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, পুরোনো নামজারির তথ্য অনলাইনে বা ডিজিটাল ভূমি রেকর্ডে রয়েছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া ভালো। রেকর্ড ডিজিটাল ব্যবস্থায় না থাকলে ভবিষ্যতে জমি বিক্রি, খাজনা প্রদানসহ বিভিন্ন কাজে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
নামজারি ছাড়া জমি বিক্রি বা দানেও সমস্যা হবে
নতুন ব্যবস্থায় জমি সংক্রান্ত লেনদেনে নামজারি ও খতিয়ানের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। জমি কেনাবেচা, দান বা হেবা করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় খতিয়ান ও নামজারির তথ্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই জমি কেনার পর দীর্ঘদিন নামজারি না করে ফেলে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জমি কেনার পর দ্রুত নামজারির আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, দলিল রেজিস্ট্রির পর যত দ্রুত সম্ভব নামজারি সম্পন্ন করা ভালো।
কী কী কাগজ লাগতে পারে?
নামজারির আবেদনের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রয়োজন হতে পারে—
– রেজিস্ট্রি দলিলের কপি
– আগের খতিয়ানের কপি
– দাগ নম্বর ও জমির প্রয়োজনীয় তথ্য
– জাতীয় পরিচয়পত্র
– উত্তরাধিকারসূত্রে হলে ওয়ারিশ সনদ
– প্রয়োজন অনুযায়ী মৃত্যুসনদ
– নির্ধারিত ফি জমার রসিদ
বর্তমানে অনলাইন ভূমিসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমেও নামজারির আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির লক্ষ্য
ভূমি মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক থাকলে নামজারির আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা। সাধারণভাবে ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রক্রিয়াটি শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে কাগজপত্রে সমস্যা, তথ্যের অসঙ্গতি কিংবা জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে সময় বেশি লাগতে পারে।
নারী ওয়ারিশদের অধিকার রক্ষায় সহায়ক হতে পারে
আইনজীবী ও ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নিয়মের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো—কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে জমির সরকারি রেকর্ড তৈরি করা কঠিন হবে।
বিশেষ করে নারী ওয়ারিশদের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তিতে মেয়েদের অংশ বাদ দেওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন সময় পাওয়া যায়।
সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হলে প্রত্যেকের মালিকানার অংশ সরকারি রেকর্ডে দৃশ্যমান থাকবে।
বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে
নতুন নিয়ম কার্যকর হলেও মাঠপর্যায়ে কিছু সমস্যার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো ওয়ারিশ বিদেশে থাকলে, কারও সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে সমস্যা হলে যৌথ নামজারির আবেদন করতে সময় লাগতে পারে।
আবার আলাদা খতিয়ান করতে হলে নিবন্ধিত বণ্টননামা করতে হবে। এতে অতিরিক্ত সময় ও খরচের প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নিয়ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।
জমির মালিকদের জন্য পরামর্শ
জমি কেনার পর দ্রুত নামজারির আবেদন করা এবং সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম সঠিকভাবে উঠেছে কি না, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
আর উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পেলে পরিবারের সব ওয়ারিশকে নিয়ে প্রথমে যৌথ নামজারি করা যেতে পারে। পরবর্তীতে প্রয়োজন হলে নিবন্ধিত বণ্টননামার মাধ্যমে পৃথক খতিয়ান করা সম্ভব।
নতুন নিয়মের মূল লক্ষ্য হলো সরকারি ভূমি রেকর্ডে প্রকৃত মালিকদের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা, ওয়ারিশদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং জমিজমা নিয়ে ভবিষ্যৎ বিরোধ ও মামলা কমানো।



