
নিজস্ব প্রতিবেদক: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খেলাপি। খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে এর হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল।
কেন এত খেলাপি ঋণ?
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে যে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ দেখা যাচ্ছে, তার পুরোটা সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হয়নি। আগের সময়ে ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ সুবিধা এবং হিসাবের বিভিন্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণকে নিয়মিত দেখানো হয়েছিল।
পরবর্তীতে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই, নিরীক্ষা ও বিভিন্ন পর্যালোচনায় অনিয়ম, জালিয়াতি এবং বেনামি ঋণের তথ্য সামনে আসতে শুরু করে। ফলে এসব ঋণের একটি বড় অংশ নতুন করে খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে দেওয়া ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং তদারকি, ব্যবসায়িক মন্দা এবং জ্বালানি সংকটকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন।
পাঁচ ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক
একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে গেছে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংকে মোট ঋণের অর্ধেকের বেশি খেলাপি রয়েছে।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণের নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছে। পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই, কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করা হয়েছে।
কাগজে ঋণ কমলেও সংকট কাটবে না
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণ অবলোপন বা পুনঃতফসিলের মাধ্যমে হিসাবের খাতায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো সম্ভব হলেও এতে প্রকৃত পাওনা আদায় নিশ্চিত হয় না।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও সতর্ক করেছে, কঠোর ঋণ শ্রেণীকরণ এবং সম্পদের মান যাচাইয়ের কারণে সামনে আরও খেলাপি ঋণ শনাক্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ জব্দ করে অর্থ আদায়, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ এবং নতুন করে অনাদায়ী ঋণ সৃষ্টি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মধ্যমেয়াদে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব। তবে নির্বিচারে ঋণ পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে সাময়িকভাবে পরিসংখ্যানের উন্নতি হলেও ব্যাংক খাতের মৌলিক সংকট দূর হবে না।

