বাংলাদেশে গোলমরিচ চাষ: সঠিক পদ্ধতিতে দীর্ঘমেয়াদি লাভের সম্ভাবনা

গোল মরিচ চাষে উপযোগী জমি ও সঠিক পরিচর্যায় বাড়ছে সম্ভাবনা, দীর্ঘমেয়াদে কৃষকের আয়ের নতুন সুযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক | BNBD365 NEWS
বাংলাদেশে মসলাজাতীয় ফসলের মধ্যে গোলমরিচের চাহিদা দীর্ঘদিনের। রান্না, মাংস ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত এই মসলার বড় একটি অংশ এখনো আমদানিনির্ভর। ফলে দেশের উপযোগী এলাকায় পরিকল্পিতভাবে গোলমরিচের বাণিজ্যিক চাষ বাড়ানো গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতাও কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে গোলমরিচ চাষ হয়ে আসছে। বিশেষ করে উঁচু, পানি নিষ্কাশনযোগ্য, আর্দ্র ও আংশিক ছায়াযুক্ত এলাকায় এ ফসল ভালোভাবে বেড়ে ওঠে।
গোলমরিচ চাষের জন্য কেমন জমি প্রয়োজন?
গোলমরিচ মূলত বহুবর্ষজীবী লতাজাতীয় উদ্ভিদ। এটি সাধারণত কোনো সহায়ক গাছ বা খুঁটিকে আঁকড়ে ওপরে উঠে বেড়ে যায়। পানি জমে থাকে এমন নিচু জমির চেয়ে উঁচু ও ভালো পানি নিষ্কাশনযুক্ত জমি গোলমরিচের জন্য বেশি উপযোগী।
উর্বর ও হিউমাসসমৃদ্ধ দো-আঁশ মাটি এ চাষের জন্য উপযুক্ত। বেলে দো-আঁশ ও এঁটেল দো-আঁশ মাটিতেও চাষ করা যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গোলমরিচ উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ পছন্দ করে এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের এলাকায় ভালো ফলন দিতে পারে।
সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও টিলাভূমি—বিশেষ করে যেখানে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিমভাবে আংশিক ছায়া তৈরি করা যায়—গোলমরিচ চাষের জন্য সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে বিবেচিত।
কখন চারা রোপণ করবেন?
বাংলাদেশে সাধারণত মে-জুন মাসে গোলমরিচের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা অনুযায়ী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ সময়ে গোলমরিচ রোপণ করা যায়।
গোলমরিচ একক ফসল হিসেবে যেমন চাষ করা যায়, তেমনি বিভিন্ন গাছের সঙ্গে মিশ্র বা সাথী ফসল হিসেবেও চাষ করা সম্ভব। সহায়ক গাছ হিসেবে মাদার, জিগা বা সুপারি জাতীয় গাছ ব্যবহার করা যেতে পারে।
জমি ও গর্ত তৈরির পদ্ধতি
বাণিজ্যিক বাগান করলে গাছ থেকে গাছের দূরত্ব প্রায় ৪ মিটার এবং সারি থেকে সারির দূরত্ব প্রায় ৫ মিটার রাখা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ × ৫০ × ৫০ সেন্টিমিটার আকারের গর্ত তৈরি করার পর জৈবসার ও প্রয়োজনীয় সার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে গর্ত প্রস্তুত করতে হয়।
অন্যদিকে বড় গাছকে অবলম্বন করে মিশ্র বা সাথী ফসল হিসেবে গোলমরিচ লাগালে গাছের গোড়ার কাছাকাছি ছোট আকারের গর্ত তৈরি করা যায়।
চারা রোপণের আগে মাটির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘসময় পানি জমে থাকলে গোলমরিচের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
কীভাবে পরিচর্যা করতে হবে?
গোলমরিচ অতিরিক্ত রোদ ও শুষ্ক বাতাস পছন্দ করে না। আবার অতিরিক্ত ছায়াও ফলন কমিয়ে দিতে পারে। তাই গাছের জন্য নিয়ন্ত্রিত ছায়া ও পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। গাছের গোড়া আলগা রাখতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাটি তুলে ভেলি তৈরি করা যেতে পারে।
জৈবসার হিসেবে পচা গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার করা যায়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের নির্দেশনায় গাছের বয়স অনুযায়ী ধীরে ধীরে সারের পরিমাণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
কত বছরে ফলন পাওয়া যায়?
গোলমরিচ চাষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এটি স্বল্পমেয়াদি ফসল নয়। চারা রোপণের পর ফলন পেতে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত ৩-৫ বছর পর ফলন শুরু হতে পারে। গাছ প্রায় ৮-৯ বছর বয়সে পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতায় পৌঁছায় এবং ভালো পরিচর্যা পেলে ২০-২৫ বছর পর্যন্ত ফলন দিতে পারে।
তবে অঞ্চল, জাত, পরিচর্যা, মাটি, আবহাওয়া ও গাছের বৃদ্ধির ওপর ফলন শুরু ও উৎপাদনের পরিমাণে পার্থক্য হতে পারে।
একটি গাছ থেকে কত গোলমরিচ পাওয়া যায়?
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বারি গোলমরিচ-১ জাতের একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে বছরে প্রায় ৩-৫ কেজি কাঁচা গোলমরিচ পাওয়া যেতে পারে। প্রক্রিয়াজাত করার পর তা থেকে আনুমানিক ১.৫-২.৫ কেজি শুকনা কালো গোলমরিচ পাওয়া যায়।
গবেষণাতেও ফলনের পার্থক্য দেখা গেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০২২-২৩ সালের এক গবেষণায় পরীক্ষাধীন একটি জার্মপ্লাজম থেকে প্রতি খুঁটিতে ১.২৮ কেজি সবুজ ফলন ও ০.৪১ কেজি শুকনা ফলন পাওয়া যায়, যেখানে পরীক্ষার তুলনামূলক বারি গোলমরিচ-১-এ ফলন ছিল কম। এর অর্থ হলো ভবিষ্যতে উন্নত জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদন আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
গোলমরিচ চাষে লাভ কত হতে পারে?
গোলমরিচের লাভ হিসাব করতে হলে শুধু জমির পরিমাণ নয়, গাছের সংখ্যা, ফলন, শুকনা গোলমরিচের বাজারদর, শ্রম, সার, সেচ, সহায়ক গাছ এবং প্রাথমিক স্থাপনা খরচ বিবেচনায় নিতে হবে।
সাম্প্রতিক বাজার প্রতিবেদনে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে কালো গোলমরিচের পাইকারি দরে প্রতি কেজি প্রায় ৬৩০ টাকা থেকে ১,০৩০ টাকার মতো বিভিন্ন দামের তথ্য পাওয়া গেছে। বাজার, মান ও সময়ভেদে দামে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে যদি বছরে ১.৫-২.৫ কেজি শুকনা গোলমরিচ পাওয়া যায়, তাহলে প্রতি কেজি ৮০০ টাকা ধরে শুধু ধারণাগত হিসাবে একটি গাছ থেকে মোট বিক্রয়মূল্য প্রায় ১,২০০-২,০০০ টাকা হতে পারে। তবে এটি নিট লাভ নয়; এখান থেকে শ্রম, সার, পরিচর্যা, শুকানো, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাদ দিতে হবে।
অর্থাৎ গোলমরিচের প্রকৃত আকর্ষণ হলো দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন। একবার ভালোভাবে বাগান প্রতিষ্ঠিত হলে একই গাছ বহু বছর ফলন দিতে পারে। তাই প্রথম কয়েক বছরের অপেক্ষা ও প্রাথমিক বিনিয়োগের পর নিয়মিত ফলন শুরু হলে কৃষকের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস হতে পারে।
আমদানিনির্ভর বাজারে দেশীয় চাষের সুযোগ
বাংলাদেশে গোলমরিচের বাজারের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। ২০২৬ সালের বিভিন্ন বাজার প্রতিবেদনে ভিয়েতনাম থেকে গোলমরিচ আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে দেশে গোলমরিচের সরবরাহ ও দামেও ওঠানামা দেখা গেছে।
এ কারণে দেশের উপযোগী অঞ্চলে বাণিজ্যিক গোলমরিচ চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় বাজারের একটি অংশ দেশীয় উৎপাদন দিয়ে পূরণ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে গোলমরিচ চাষের সফলতার উদাহরণও রয়েছে। কয়েক বছর আগে মীরসরাই ও ফটিকছড়ির পাহাড়ি এলাকায় কৃষকেরা বাণিজ্যিকভাবে গোলমরিচ চাষ করে ফলন পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ফেনী হর্টিকালচার সেন্টারে পরীক্ষামূলকভাবে গোলমরিচ চাষ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। সফল হলে সেখানে চারা উৎপাদন ও কৃষকদের বাণিজ্যিক চাষে উদ্বুদ্ধ করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল।
গোলমরিচ চাষে ঝুঁকিও রয়েছে
লাভের সম্ভাবনা থাকলেও গোলমরিচকে দ্রুত লাভের ফসল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ প্রথম কয়েক বছর ফলনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
অতিরিক্ত পানি, রোগবালাই, অনিয়ন্ত্রিত ছায়া, শুষ্ক আবহাওয়া, নিম্নমানের চারা এবং ভুল পরিচর্যা উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি বাজারদর কমে গেলে কৃষকের প্রত্যাশিত আয়ও কমতে পারে।
তাই বড় আকারে বিনিয়োগের আগে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া, মাটি ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পরীক্ষা করা এবং পরীক্ষামূলকভাবে ছোট পরিসরে চাষ শুরু করা তুলনামূলক নিরাপদ পদ্ধতি হতে পারে।
কৃষকদের জন্য সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র
বাংলাদেশে গোলমরিচের চাষ এখনো তুলনামূলক সীমিত হলেও দেশের কিছু পাহাড়ি ও উঁচু অঞ্চলের পরিবেশ এ ফসলের জন্য উপযোগী। কৃষি গবেষণায় নতুন জার্মপ্লাজম ও উন্নত জাত নিয়ে কাজও চলছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত জাত, মানসম্মত চারা, সঠিক ছায়া ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি নিশ্চিত করা গেলে দেশে গোলমরিচের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে গোলমরিচ এমন একটি ফসল, যেখানে তাৎক্ষণিক লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত জমি, ভালো চারা ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে পাহাড়ি ও উঁচু জমিতে গোলমরিচ চাষ কৃষকের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বহুবর্ষজীবী অর্থকরী ফসলে পরিণত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস, বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং সাম্প্রতিক বাজার প্রতিবেদন।
ব্রেকিং নিউজ বিডি
সব খবর সবার আগে



