কে এই জ্ঞানেশ কুমার, যাকে ঘিরে উত্তাল ভারত?

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক, পদত্যাগের দাবি ও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নের মুখে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১০ অক্টোবর ২০২৬
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়ছে। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করছেন বিরোধী দল ও বিভিন্ন আন্দোলনকারী গোষ্ঠী। অন্যদিকে, এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জ্ঞানেশ কুমার।
সম্প্রতি ভারতের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের পর বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভোটার তালিকা, নিবন্ধন পদ্ধতি ও কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে গত ১০ মাসে তার দুই ডেপুটি অন্তত ১৪টি আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে এই বিতর্কের সূত্রপাত। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সংশোধনের নামে ভোটার তালিকায় কারসাজি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার
জ্ঞানেশ কুমারের জন্ম ও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সীমিত হলেও তার প্রশাসনিক কর্মজীবন দীর্ঘ। ১৯৬৪ সালের দিকে জন্ম নেওয়া এই ভারতীয় কর্মকর্তা উত্তর প্রদেশের একটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৮ সালে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা বা আইএএসে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।
কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন জ্ঞানেশ কুমার। পরে কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০১৬ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জম্মু ও কাশ্মীরবিষয়ক বিভাগে দায়িত্ব পান তিনি। ওই সময় জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন-সংক্রান্ত আইনের খসড়া প্রণয়নের কাজে যুক্ত ছিলেন। ২০১৯ সালে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর অঞ্চলটির বিশেষ আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করা হয়।
অযোধ্যার রাম মন্দির প্রকল্পেও যুক্ত ছিলেন
ভারতের অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন জ্ঞানেশ কুমার। ২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়নে গঠিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। মন্দির নির্মাণ তদারকি ও সংশ্লিষ্ট ট্রাস্ট গঠনের কাজেও তার ভূমিকা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ওই ট্রাস্টের বিরুদ্ধে অনুদানের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ ওঠে। তবে অভিযোগ ওঠা মানেই তা প্রমাণিত হওয়া নয়; এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।
অবসরের পর দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রশাসনিক চাকরি থেকে অবসর নেন জ্ঞানেশ কুমার। এরপর একই বছরের মার্চে ভারতের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তার নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালে প্রণীত নতুন আইনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটির কাঠামো পরিবর্তন করা হয়। আগের ব্যবস্থায় থাকা ভারতের প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করেন বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। আইনটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টেও মামলা হয়েছে। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে নতুন সংকট
বর্তমানে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রধান কারণ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রম। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং এর ফলে ভোটারদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ কারণে তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ চাইছেন।
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে আপত্তির খবর প্রকাশিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশ্ন আরও বেড়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য স্বাধীন তদন্ত, প্রামাণ্য নথি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ পদে আসীন হওয়া জ্ঞানেশ কুমার এখন রাজনৈতিক চাপ ও সমালোচনার মুখে। ভোটার তালিকা সংশোধন, নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিতর্ক এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের মধ্যে পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তা নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ ও অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ যাচাইয়ের ওপর।
দৈনিক দেশ দুনিয়া
চলো একসাথে এগিয়ে যাই



