ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কা, উত্তর আমেরিকা থেকে ৮৬ টন স্বর্ণ লন্ডনে নিল নেদারল্যান্ডস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:প্রকাশ ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় নিজেদের স্বর্ণের মজুত ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে নেদারল্যান্ডস। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডি নেদারল্যান্ডশে ব্যাংক (DNB) যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত প্রায় ৮৬ টন স্বর্ণ লন্ডনে স্থানান্তর করেছে।
DNB জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে কয়েক ধাপে এই স্থানান্তর সম্পন্ন করা হয়। উত্তর আমেরিকার নিউইয়র্ক ও অটোয়ায় থাকা স্বর্ণের একটি অংশ সরিয়ে লন্ডনে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো সংকটের সময় স্বর্ণকে আরও দ্রুত ও সহজে ব্যবহারযোগ্য করা এবং দেশের আর্থিক প্রস্তুতি জোরদার করা।
কেন লন্ডনে নেওয়া হলো স্বর্ণ?
DNB বলছে, লন্ডনে সংরক্ষিত স্বর্ণ বিশ্বের সবচেয়ে সহজে লেনদেনযোগ্য স্বর্ণের মধ্যে পড়ে। ফলে কোনো গুরুতর অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে নিউইয়র্ক বা অটোয়ার তুলনায় লন্ডনে থাকা স্বর্ণ দ্রুত বাজারে ব্যবহার বা বিক্রি করা সম্ভব।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, বাণিজ্য বিরোধ, নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা এবং অন্যান্য ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ছে। এসব পরিস্থিতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পাশাপাশি স্বর্ণের মজুতও যেন দ্রুত ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সব স্বর্ণ কি সরাসরি পরিবহন করা হয়েছে?
না। ৮৬ টন স্বর্ণের পুরোটা শারীরিকভাবে উত্তর আমেরিকা থেকে লন্ডনে নেওয়া হয়নি। স্থানান্তরের একটি অংশ সরাসরি পরিবহনের মাধ্যমে এবং বাকি অংশ বিক্রি ও পুনরায় কেনার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে।
DNB-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৭ টনের কিছু বেশি স্বর্ণ উত্তর আমেরিকা থেকে নেদারল্যান্ডসের জেইস্টে নিরাপদ স্থাপনায় আনা হয়। পরে একই পরিমাণ স্বর্ণ জেইস্ট থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়। এর ফলে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের বার গলিয়ে নতুন করে প্রস্তুত করার প্রয়োজন হয়নি।
অন্যদিকে, প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করে লন্ডনে সমপরিমাণ স্বর্ণ কেনা হয়েছে। অর্থাৎ এই অংশে স্বর্ণের মালিকানা ও মজুতের হিসাব পরিবর্তিত হলেও পুরো পরিমাণ শারীরিকভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পরিবহনের প্রয়োজন পড়েনি।
কোথায় কত স্বর্ণ থাকছে?
স্থানান্তরের পর নেদারল্যান্ডসের স্বর্ণ মজুতের ভৌগোলিক বণ্টনও বদলে গেছে। লন্ডনে থাকা স্বর্ণের অংশ বেড়ে প্রায় ৩২.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে নিউইয়র্কে থাকা অংশ কমে প্রায় ১৮.৫ শতাংশে এবং কানাডাতেও প্রায় ১৮.৫ শতাংশে নেমেছে। নেদারল্যান্ডসের নিজস্ব ভূখণ্ডে প্রায় ৩০.৮ শতাংশ স্বর্ণ রয়েছে।
DNB-এর মোট স্বর্ণ মজুত প্রায় ৬১২.৪ টন। ২০২৫ সালের শেষের হিসাব অনুযায়ী, এই স্বর্ণের মূল্য ছিল আনুমানিক ৭২.২ বিলিয়ন ইউরো।
বাণিজ্য বিরোধও কি কারণ?
DNB সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা সরকারের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসের কথা বলেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য বিরোধসহ সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে স্বর্ণের দ্রুত ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করাকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী, স্বর্ণের অবস্থান এমনভাবে ছড়িয়ে রাখা হচ্ছে যাতে গুরুতর সংকটের সময় কোনো একটি অঞ্চল বা বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না থাকে। ফলে এই সিদ্ধান্তকে মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সংকটকালীন প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতি’—DNB-এর অবস্থান
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে স্বর্ণের মজুত নিয়ে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হলেও DNB জানিয়েছে, স্বর্ণ এখনই ব্যবহার করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। বরং সম্ভাব্য সংকটের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতেই মজুতের অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের স্বর্ণের মজুতের নিরাপত্তা, তারল্য এবং দ্রুত লেনদেনযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। নেদারল্যান্ডসের এই পদক্ষেপও সেই বৃহত্তর প্রবণতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।



