১৫ আগস্ট: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিবৃত্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক |Bnbd News 365
আজ ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বেদনাবিধুর দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে একদল সেনাসদস্যের হামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। একই ঘটনায় তাঁর পরিবারের সদস্যসহ আরও কয়েকজন প্রাণ হারান। ২০২৬ সালে সেই হত্যাকাণ্ডের ৫১ বছর পূর্ণ হলো।
তবে ১৫ আগস্টকে শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের দিন হিসেবে দেখলে শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের একটি বড় অংশ অজানা থেকে যায়। প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।
জন্ম ও শৈশব
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা শেখ লুৎফর রহমান এবং মা শেখ সায়েরা খাতুন। পরিবারের সদস্যরা ছোটবেলায় তাঁকে ‘খোকা’ নামে ডাকতেন।
টুঙ্গিপাড়ার পরিবেশেই তাঁর শৈশব কাটে। ছাত্রজীবন থেকেই মানুষের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক বিষয়ে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সেই আগ্রহ তাঁকে সক্রিয় রাজনীতিতে নিয়ে যায়।
শিক্ষাজীবনে তিনি গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়াশোনা করেন এবং ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯৪৬ সালে তিনি ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন
পাকিস্তান আন্দোলন থেকে বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিয়ে নতুন করে সংকট তৈরি হয়। শেখ মুজিবুর রহমান তখন তরুণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পর তিনি দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নেতৃত্বে দলটি পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
ছয় দফা ও বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। এই কর্মসূচিতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি সামনে আসে।
ছয় দফাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও রাজনৈতিক নিপীড়ন চালানো হয়। কিন্তু এর মধ্যেই তিনি পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ব্যাপকভাবে পরিচিত হন। এই সময় তাঁর নেতৃত্ব বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে
১৯৭০-এর নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকট
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনের ফল অনুযায়ী সরকার গঠনের সাংবিধানিক অধিকার আওয়ামী লীগের থাকলেও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়।
এই সংকট ধীরে ধীরে স্বাধীনতার আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যায়। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় পূর্ব বাংলার প্রশাসন কার্যত তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে পরিচালিত হতে থাকে।
৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রমনা রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।
ভাষণে তিনি বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সামনে আনেন। তাঁর বক্তব্যের বহুল উদ্ধৃত অংশ ছিল—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
এই ভাষণ পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে স্থান পায়।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী পূর্ব বাংলায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। এর পরপরই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।
শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হতে থাকে। নয় মাসের যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তাঁর দেশে ফেরার দিনটি পরবর্তীতে ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস’ হিসেবে পরিচিত হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান নতুন রাষ্ট্রের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রশাসন পুনর্গঠন, অর্থনীতি সচল করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন ছিল সে সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।
স্বাধীনতার প্রথম কয়েক বছরে সরকারকে খাদ্যসংকট, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো নানা সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়।
একই সঙ্গে দেশের জন্য সংবিধান প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার কাজও এগিয়ে নেওয়া হয়।
রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক বিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা সমালোচনা তৈরি হয়।
১৯৭৫ সালে রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে সশস্ত্র সেনাসদস্যদের একটি দল হামলা চালায়। শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হত্যা করা হয়।
সেদিন তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল এবং ভাই শেখ আবু নাসেরসহ আরও কয়েকজন নিহত হন।
একই রাতে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগনে শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি এবং আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হন।
তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তখন দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।



