
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী (২০২৬) উপলক্ষে ফিরে দেখা
Bnbd365 News Desk:২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ঢাকার রাজপথে তখন উত্তাল জনস্রোত। আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার চাপে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু এই বিদায় ছিল আকস্মিক নয়; এর পেছনে ছিল কয়েকদিনের নীরব রাজনৈতিক নাটক, সেনাবাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং গণভবনে শেষ মুহূর্তের একের পর এক সিদ্ধান্তহীনতার ইতিহাস।
৩ আগস্ট: সেনা সদরে ‘না’-এর সুর
আন্দোলন যখন চরমে, তখন ৩ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা সদরে এক গুরুত্বপূর্ণ ‘দরবার’ ডাকেন। সেখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন— জনগণের বুকে গুলি চালানো হবে না। কারণ, সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্র এতটাই প্রাণঘাতী (১৪.৫ ক্যালিবারের গুলি) যে একটিতে ৫-৭ জনের প্রাণ যেতে পারে। এই অবস্থানই শেখ হাসিনার পায়ের নিচ থেকে প্রথমবারের মতো মাটি সরিয়ে দেয়।
৪ আগস্ট গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে চলে একাধিক বৈঠক। উপস্থিত ছিলেন তিন বাহিনীর প্রধান, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ও অন্যান্য নেতারা। সেখানে উত্তেজনা প্রশমনে ‘লকডাউন’ ঘোষণা, জরুরি অবস্থা জারি, এমনকি আন্দোলন দমনে ক্যাডার বাহিনীকে অস্ত্রসহ নামানোর মতো পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে ওই রাতেই সেনাপ্রধান শেখ হাসিনাকে একান্তে জানিয়ে দেন, “আপনার হাতে আর সময় নেই।” পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বসে সমাধানের পথ খোঁজার পরামর্শ দেন তিনি। কিন্তু মাটি খুঁড়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তখনও ক্ষমতা ছাড়তে আগ্রহী ছিলেন না। বরং, পশ্চিমা একটি দেশের কূটনীতিকের সাথে আইনমন্ত্রীর বৈঠকের পর পদত্যাগ ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের একটি বিকল্প পথও আলোচনায় আসে। তবে সেই সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত হয়নি।
৫ আগস্ট সকাল ১০টায় আবারও সেনাপ্রধানকে ডাকেন শেখ হাসিনা। তার হাতে ছিল নিজ হাতে লেখা পদত্যাগপত্র। তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানান, কিন্তু দেশ ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা তখনও পরিষ্কার ছিল না। সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান তা নিয়ে ফিরে যান এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জরুরি বৈঠকের আয়োজন করেন।
কিন্তু মাঠের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সকাল থেকেই উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও সাভার থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকার দিকে এগোতে থাকে। তাদের লক্ষ্য—গণভবন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সরকারের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে যায়। দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে নিজের ছোট বোন শেখ রেহানা ও প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিককে নিয়ে গণভবনের পেছনের মাঠ থেকে হেলিকপ্টারে উঠেন শেখ হাসিনা। কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে নেমে তিনি সি-১৩০ কার্গো বিমানে চড়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন, যা স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৩৬ মিনিটে দিল্লির কাছে হিন্দন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছায়। সেখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তাকে অভ্যর্থনা জানান।
পালানোর পেছনের চূড়ান্ত ধাক্কা :গণভবনের সূত্র বলছে, শেষ পর্যন্ত তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাথে ফোনালাপে সামরিক কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানান, “প্রাণে বাঁচতে হলে এখনই পদত্যাগ ও দেশত্যাগ করতে হবে।” পরিবারের জোরালো অনুরোধে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। তার বিদায়ের খবর আগে থেকে জানতে পারেননি বেশিরভাগ মন্ত্রী ও দলীয় নেতা। ফলে হঠাৎ করেই তারা দিশাহারা হয়ে পড়েন; কেউ আত্মগোপন করেন, কেউ ছদ্মবেশে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ৩ থেকে ৫ আগস্টের এই ৭২ ঘণ্টায় শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তহীনতা এবং বারবার পরিবর্তন হওয়া পরিকল্পনাই তার পতন ত্বরান্বিত করে। তিনি যেমন আন্দোলন দমনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে চেয়েছেন, আবার জরুরি অবস্থা বা পদত্যাগের আলোচনাও করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো পথেই টিকে থাকতে পারেননি। সেনাবাহিনী যখন জনগণের বিপক্ষে না দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়, তখন তার কার্যকর কোনো বিকল্প ছিল না। দেরিতে নেওয়া পদত্যাগের সিদ্ধান্ত আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি; বরং তার নিজের দলকেও হতভম্ব করে দিয়েছে।

শেখ হাসিনার পতন: আন্দোলনের সূচনা থেকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ

শেখ হাসিনার পতন: আন্দোলনের সূচনা থেকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন। কিন্তু এই পতন আকস্মিক ছিল না; এর পেছনে ছিল কয়েক মাস ধরে চলা আন্দোলন, সেনাবাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং শেষ মুহূর্তের জটিল রাজনৈতিক গণনা।
আন্দোলনের সূচনা: চাকরির কোটা থেকে সাধারণ বিদ্রোহ।২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, যার মূল দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু সরকারের কঠোর দমননীতি ও বলপ্রয়োগের কারণে এই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। জুলাই মাসে সংঘর্ষে কমপক্ষে ১৫০ জন নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন। ২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট কোটা ব্যবস্থা বাতিল করলেও, আন্দোলন থামেনি বরং তা শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে রূপ নেয়।৩ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা সদরে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডাকেন। সেখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন— জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার করা হবে না। এই অবস্থানই শেখ হাসিনার পায়ের নিচ থেকে প্রথমবারের মতো মাটি সরিয়ে দেয়।
৪ আগস্ট গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে চলে একাধিক বৈঠক। সেখানে ‘লকডাউন’ ঘোষণা, জরুরি অবস্থা জারি, এমনকি আন্দোলন দমনে ক্যাডার বাহিনীকে অস্ত্রসহ নামানোর মতো পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু ওই রাতেই সেনাপ্রধান শেখ হাসিনাকে জানিয়ে দেন, “আপনার হাতে আর সময় নেই।”
৫ আগস্ট সকালে শেখ হাসিনা তাঁর পদত্যাগপত্র হাতে নিয়ে সেনাপ্রধানকে ডাকেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও সাভার থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকার দিকে এগোতে থাকে। তাদের লক্ষ্য—গণভবন। দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে তিনি হেলিকপ্টারে করে গণভবন ত্যাগ করেন। সি-১৩০ কার্গো বিমানে চড়ে তিনি ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং দিল্লির কাছে হিন্দন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। সেখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তাকে অভ্যর্থনা জানান।
দেশত্যাগের পর পরিস্থিতি:শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরপরই সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশ্যে টেলিভিশন ভাষণে তার পদত্যাগের কথা নিশ্চিত করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন একই দিনে উত্তাল জনতা বিনা বাধায় গণভবনে প্রবেশ করে এবং আসবাবপত্র লুট করতে থাকে। আওয়ামী লীগের নেতাদের বাড়ি ও পুলিশ স্টেশনেও হামলা চালানো হয়। আন্দোলনকারীরা শেখ মুজিবুর রহমানের মূর্তি ভাঙচুর করে এবং তার নামাঙ্কিত জাদুঘরে আগুন দেয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পথে
৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সংসদ ভেঙে দেন—যা ছিল আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলোর একটি। একই দিনে তিনি কারাবন্দী বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন।
শিক্ষার্থী আন্দোলনের সমন্বয়করা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগের দাবি জানান। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম জানান, তারা ইতিমধ্যেই ইউনূসের সাথে কথা বলেছেন এবং তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এই দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শান্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের আহ্বান জানান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব পক্ষকে সহিংসতা এড়ানোর আহ্বান জানায়। চীন শীঘ্রই সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে।
ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানান, শেখ হাসিনাকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে এবং তিনি ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নেওয়ার সময় পাবেন। খবর অনুযায়ী, তিনি লন্ডনে যেতে চাইলেও, যুক্তরাজ্য সরকারের সহিংসতার তদন্তের আহ্বান সেই পরিকল্পনা অনিশ্চিত করে দেয়।
বিশ্লেষণ:এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট হয়, ৩ থেকে ৫ আগস্টের ৭২ ঘণ্টায় শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তহীনতা এবং বারবার পরিবর্তন হওয়া পরিকল্পনাই তাঁর পতন ত্বরান্বিত করে। দেরিতে নেওয়া পদত্যাগের সিদ্ধান্ত আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি; বরং তার নিজের দলকেও হতভম্ব করে দিয়েছে। সেনাবাহিনী যখন জনগণের বিপক্ষে না দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়, তখন তার কার্যকর কোনো বিকল্প ছিল না। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন কেবল একটি সরকারের পতনই ঘটায়নি, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

৫ আগস্ট 2024:ফাইল ফটো



