৩৬ জুলাই: রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী ও নতুন বাংলাদেশের গোড়াপত্তন


Bnbd365 News Desk;আজ ৫ আগস্ট, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চারণের দিন—‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’। ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার বুকের রক্তে ভেসে গিয়েছিল দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসন। রাজপথের তপ্ত স্লোগান, মায়ের কান্না, আর শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্ত।
শুরুটা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একগুচ্ছ শিক্ষার্থীর নির্বিঘ্ন প্রতিবাদ। কিন্তু সেই প্রতিবাদ ক্রমান্বয়ে বেঁকে দাঁড়ায় বৈষম্যবিরোধী নতুন সমাজব্যবস্থার প্রশ্নে। ২০২৪ সালের ৫ জুন যাত্রা শুরু করে, ১ জুলাই তা পায় সংগঠিত রূপ। সরকার যখন এ বিষয়টিকে ‘আদালতের এখতিয়ার’ বলে উল্লেখ করে, তখন আন্দোলন আরও বিক্ষোভমুখর হয়ে ওঠে।
আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ১৫ জুলাই—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী আবু সাঈদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গণমাধ্যমের কল্যাণে সেই দৃশ্য দেশের প্রতিটি প্রান্তে আগুনের মতো ছড়িয়ে যায়। সরকার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে, ইন্টারনেট বন্ধ করে, তবে এতে প্রতিবাদের বাষ্প কমার বদলে তা আরও ঘনীভূত হয়। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ—চাকরিজীবী, গার্মেন্টসকর্মী, চিকিৎসক, অভিনেতা, লেখক—সবাই এক হয়ে ওঠেন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’এর পক্ষে।
আন্দোলনের গতি তখন আর থামার নয়। ৩ আগস্ট আন্দোলনকারীরা ‘একদফা’ দাবি ঘোষণা করলে, গণজোয়ার আরও তীব্র হয়। ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ডাক পড়ে। কারফিউ উপেক্ষা করে ভোর হতে না হতেই মানুষ ছুটে আসেন নানা পথে—কেউ বাসে, কেউ ট্রাকে, কেউবা পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল। রাজপথ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয় রাজধানী। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীরা গণভবন অভিমুখে অগ্রসর হন।
ঠিক তখনই—ঐতিহাসিক সেই দুপুরে—শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন হয়, এবং গণতন্ত্রের নতুন সম্ভাবনার উদয় ঘটে। পরে সরকার ৫ আগস্টকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়। তবে যারা রক্ত দিয়েছেন, তারা জানেন—এই আন্দোলনের মাস জুলাইকে তারা মনে রেখেছেন ‘৩৬ জুলাই’ নামে; রক্তের স্রোত যে থেমে যায়নি আগস্টের প্রথম দিনেও।
শহীদের তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হয়েছে—সারা দেশে দেড় হাজারের বেশি প্রাণ ঝরেছে, আহত হয়েছেন প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। তাদের অনেকেই আজীবন দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন—চোখের আলো কেড়ে নিয়েছিল পুলিশের রাবারের গুলি আর কাঁদানে গ্যাসের শেল। দেশের ইতিহাসে এমন রক্তাক্ত গণআন্দোলন বিরল।
শেখ হাসিনার পালানোর পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সরকারপ্রধানের এই দায়িত্বে তাকে সহায়তা করেন শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও পরবর্তীতে মাহফুজ আলম—উপদেষ্টা হিসেবে। সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেড় বছর দেশ পরিচালনার পর ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। সেই নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে এবং বর্তমানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করছে।
আজ, ২০২৬ সালের এই ৫ আগস্ট, নতুন বাংলাদেশ তার রক্তাক্ত অতীতকে স্মরণ করছে—শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে, আর আগামীর পথচলার প্রতিজ্ঞা করছে। কারণ, ইতিহাসের এই অধ্যায় লেখা হয়েছিল বুকের রক্তে, আর তা কখনো মুছে যাবে না।



