রাজধানীতে বাড়ছে কন্ট্রাক্ট কিলিং: ছয় মাসে ১২২ হত্যা, সক্রিয় ৪০১ শুটার

ক্রাইম রিপোর্টার:BNBD NEWS
রাজধানীর অন্ধকার জগতে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ভাড়াটে খুনিদের দাপট। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে একের পর এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এসব হত্যাকাণ্ডে পেশাদার শুটার ভাড়া করার প্রবণতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজধানীতে মোট ১২২টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৯টি ছিল পরিকল্পিত ‘কন্ট্রাক্ট কিলিং’ বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংঘাতকে কেন্দ্র করে。 ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে সক্রিয় ভাড়াটে শুটারের সংখ্যা প্রায় ৪০১ জন。
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত ২৪ জুলাই রাতে মিরপুরের কাফরুলে যুবদলকর্মী মো. ইউসুফ আলী গুলিতে নিহত হন। ডিবির তদন্তে জানা যায়, প্রকৃত টার্গেট অন্য ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু ঘটনাস্থলে বাগবিতণ্ডার জেরে শুটারদের গুলিতে প্রাণ হারান ইউসুফ। স্থানীয় আধিপত্য, টেন্ডার ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে চারজন পেশাদার শুটার ভাড়া করে আনা হয়েছিল। এ ঘটনায় প্রধান শুটার চঞ্চল মোল্যাসহ আটজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ。
এর আগে ১২ জুন পশ্চিম রামপুরায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে কাইল্লা পলাশকে। তদন্তে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তার ও পুরোনো বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে。 এছাড়া ২৮ এপ্রিল নিউমার্কেটে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডে ভাড়াটে শুটার ব্যবহারের তথ্য পেয়েছে ডিবি। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি কাওরান বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডেও ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে ভাড়াটে শুটার ব্যবহার করা হয়েছিল। এছাড়া গুলশান-বাড্ডায় ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে সুমন হত্যা এবং গুদারাঘাটে বিএনপি নেতা সাধন হত্যাকাণ্ডে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে
ডিএমপির গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আটটি অপরাধ বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভাড়াটে শুটার সক্রিয় মতিঝিল বিভাগে—যেখানে তালিকাভুক্ত শুটারের সংখ্যা ১১৮ জন। এর মধ্যে শুধু মতিঝিল থানাতেই ১০৬ জন। ওয়ারী বিভাগে ৭৩, তেজগাঁওয়ে ৬১, মিরপুরে ৬০, রমনায় ৩৬, লালবাগে ২৪, গুলশানে ১৬ এবং উত্তরায় ১৩ জন ভাড়াটে শুটারের তথ্য রয়েছে। সম্প্রতি এই তালিকা নতুন করে হালনাগাদ করছে ডিএমপি।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সংঘবদ্ধ অপরাধ, যার সঙ্গে রাষ্ট্র ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিপক্ষকে দুর্বল ও দমন করার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে, যা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র দীর্ঘদিন ধরে এভাবে সক্রিয় থাকতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন এই অধ্যাপক।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও ডিবিপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হচ্ছে। ভাড়াটে শুটার ও পেশাদার খুনিদের তালিকা প্রতিনিয়ত আপডেট করা হচ্ছে এবং তাদের আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অপরাধী যেই হোক, কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু শুটারদের গ্রেফতার করলেই হত্যা বা আধিপত্য বিস্তার বন্ধ হবে না। কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ের অর্থদাতা, পরিকল্পনাকারী এবং তাদের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে না পারলে রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভাড়াটে খুনিদের দাপট আরও বাড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন。



