জেন-জি প্রতিবাদে নড়েচড়ে বসেছে মোদীশিবির, রাজ্য নির্বাচনের আগে বড় চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক ডেক্স:BnBd365 News
ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছিল না; এটি যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা যুবঅসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্ম নেওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর ব্যানারে তরুণ-তরুণীরা যখন রাজপথে নামে, তখন কে জানত যে এই আন্দোলন মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মতো বিরল রাজনৈতিক সাফল্য বয়ে আনবে?
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে বিহার, পশ্চিমবঙ্গসহ একাধিক রাজ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ‘ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট’ (নিট-ইউজি) প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন দ্রুতই মোদি সরকারের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০ জুলাই ‘সংসদ চলো’ অভিযানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাসের ঘটনা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে।
শনিবার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি পূরণ হয়েছে। তবে এটি কেবল একটি মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়; বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য এক বিরল রাজনৈতিক ধাক্কা। লন্ডনের এসওএসএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঞ্জয় শ্রীবাস্তবের মতে, এই বিক্ষোভে মোদির নিজস্ব সমর্থকেরাও যোগ দিয়েছিলেন—যা অতীতের কোনো আন্দোলনে দেখা যায়নি।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল এই আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ, কিন্তু এর মূল উৎস অনেক গভীরে। তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের উদ্বেগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর ভীতি, এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিজেদের প্রতিনিধিত্বহীনতার অনুভূতি—এই সব মিলেই জ্বালানি যোগায় এই আন্দোলনকে। বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার গড় বয়স ৬০ বছরের বেশি, অথচ ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ হলেও লোকসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১০ শতাংশ।
ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক এই নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান মোদি ও বিজেপির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ। মাত্র কয়েক দিনে সিজেপির অনুসারী সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে বিজেপির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের অনুসারী মাত্র ১ কোটি। কলাম লেখক সন্তোষ দেশাইয়ের মতে, ইনস্টাগ্রামের জন্য প্রয়োজন ‘প্রামাণিক ও নিজস্ব ভাবমূর্তি’—যা আগে থেকে তৈরি বার্তায় পাওয়া যায় না। এই প্রজন্মের মধ্যে ‘অন্ধ শ্রদ্ধাবোধ নেই’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিতাভ তিওয়ারি মনে করেন, এই আন্দোলন দেখিয়েছে যে ‘এখন থেকে যে নেতা মানুষের কথা শুনবেন, তিনিই ভালো করবেন’। মোদি নিজেও বিরল একটি সেলফি ভিডিওতে আন্দোলনকারীদের দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে সংশোধনী পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—যা তাঁর প্রায় এক দশকের শাসনামলে তুলনামূলকভাবে নজিরবিহীন।
আগামী বছর উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব ও গুজরাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের নির্বাচনের আগে এই যুবআন্দোলন মোদি ও বিজেপির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিজেপি এখনো নির্বাচনী রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি, তবে তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক উদাহরণ দেখিয়েছে—ইনস্টাগ্রামভিত্তি যুবসমর্থনই থালাপতি বিজয়কে মুখ্যমন্ত্রীর পদ এনে দিয়েছে। বিজেপি কি এই পরিবর্তিত সমীকরণ মোকাবিলায় প্রস্তুত? নাকি জেন-জি প্রজন্মের এই ক্ষোভ ভারতের রাজনীতির গতিপথই বদলে দেবে—সেটাই এখন দেখার।


