ভারতে বাংলাভাষী মুসলিম ও রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ, প্রতিবাদ দিল্লির

BNBD NEWS:আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতে বাংলাভাষী মুসলিম, দলিত, তফসিলি জাতি এবং রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, হয়রানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটি (ইউএনসিইআরডি)।
মঙ্গলবার রাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের এই কমিটি জানায়, ভারতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে দলিত, তফসিলি আদিবাসী, বাংলাভাষী মুসলিম ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিনই এর তীব্র সমালোচনা করেছে ভারত। জাতিসংঘে ভারতের মিশন ইউএনসিইআরডির পর্যবেক্ষণ প্রত্যাখ্যান করে এটিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘বিদ্বেষপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছে।
অভিযান ও আটকের অভিযোগ
এএফপির বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউএনসিইআরডি ২০১৭ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া একটি নির্দেশনা এবং ২০২৫ সালের পেহেলগাম হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে।
কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব ঘটনার পর রোহিঙ্গা, বাংলাভাষী মুসলিম, অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের লক্ষ্য করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, আটক ও হয়রানির অভিযোগ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে জাতিগত বিদ্বেষ থেকে সহিংসতা, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া আটক, নির্যাতন, দুর্ব্যবহার ও যৌন সহিংসতার মতো গুরুতর অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউএনসিইআরডি।
জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো নিয়েও উদ্বেগ
জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে রাস্তায় মানুষকে থামিয়ে তল্লাশি ও আটকের অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘের কমিটি। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গ্রেপ্তার, আটক ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে।
আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়েও সতর্ক করেছে ইউএনসিইআরডি।
বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য, বর্ণবাদী বক্তব্য ও ঘৃণামূলক অপরাধ বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো জনগোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে দেশ থেকে বহিষ্কার না করার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাভাষীদের আটক নিয়ে অভিযোগ
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৭ সালের ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনায় রোহিঙ্গাসহ বৈধ কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল।
এদিকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে পেহেলগামে হামলার পর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আসা ‘সন্দেহভাজন নথিবিহীন’ অভিবাসীদের পরিচয় যাচাইয়ের নির্দেশ দেয়।
এরপর বিজেপিশাসিত কয়েকটি রাজ্যে বাংলাভাষী, বিশেষ করে মুসলিমদের আটক করে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়ার অভিযোগ ওঠে। নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে না পারায় কয়েকজনকে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনাও ঘটে। পরে কিছু ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, ভুলভাবে তাদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভারতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
ভারতের জবাব
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ইউএনসিইআরডির পর্যালোচনা বৈঠকে ভারত তার সাংবিধানিক সুরক্ষা, আইনি কাঠামো, বহুত্ববাদ এবং পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছে।
তিনি জানান, নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় কমিটির পর্যবেক্ষণের জবাব দেবে ভারত।
তবে পর্যালোচনা বৈঠকের সময় ভারতের আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রতিনিধিদল ইউএনসিইআরডির কিছু মন্তব্যকে ‘ঢালাও’ ও ‘ভিত্তিহীন’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করেছে।
জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটি ১৮ জন স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত। জাতিগত বৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো ওই সনদের শর্ত কতটা মেনে চলছে, তা পর্যবেক্ষণ করাই এ কমিটির অন্যতম দায়িত্ব।



