সৌদি আরবে সোফা কারখানায় ভয়াবহ আগুন, ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক:ব্রেকিং নিউজ বিডি 365
সৌদি আরবে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৩ বাংলাদেশি শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১০ জন এবং নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার ৩ জন রয়েছেন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আত্রাই উপজেলার ১০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে ১৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নিহতদের সবাই বাংলাদেশি হতে পারেন। ফলে নিহতের সংখ্যা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
যেভাবে আগুনের সূত্রপাত:জানা গেছে, রোববার বাংলাদেশ সময় আনুমানিক বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে।
কারখানাটিতে বিপুল পরিমাণ দাহ্য সামগ্রী ও সোফা তৈরির বিভিন্ন উপকরণ থাকায় আগুন দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। খবর পেয়ে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।
আগুনের তীব্রতার কারণে কারখানার ভেতরে থাকা শ্রমিকদের অনেকেই বের হতে পারেননি বলে জানা গেছে। উদ্ধারকাজ চলাকালে বেশ কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নওগাঁর যে ১০ জন নিহত:নিহতদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ১০ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন—
– কালিকাপুর ইউনিয়নের কলি, বয়স ৩০ বছর
– লুৎফর, বয়স ৩২ বছর
– জান্ডার
– রুবেল
– বিশা এলাকার সাগর
– মজিদুল
– দুবাই এলাকার শুভ
– সুমন
– পারকাসুন্দা গ্রামের জালাল
– উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ শেখ
তবে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং সব মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর চূড়ান্ত তালিকা পাওয়া যাবে।
নাটোরের তিনজনও প্রাণ হারিয়েছেন:অগ্নিকাণ্ডে নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার তিন বাংলাদেশি শ্রমিকও নিহত হয়েছেন। তারা হলেন—
-খাজুরা ইউনিয়নের দিঘির পাড় গ্রামের শামীম হোসেন
-শ্রীপুর গ্রামের সাব্বির হোসেন
-মহিষডাঙ্গা গ্রামের রবিউল আউয়াল
তাদের মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছানোর পর পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
পরিচয় নিশ্চিতের অপেক্ষায় অনেক পরিবার:নিহতদের অনেকেই জীবিকার সন্ধানে কয়েক বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানো এবং স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে তারা বিদেশে গিয়ে ওই কারখানায় কাজ করছিলেন।
কিন্তু হঠাৎ ভয়াবহ আগুনে তাদের প্রাণহানির ঘটনায় পরিবারগুলোর সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে গেছে। অনেক পরিবার এখনো প্রিয়জনের মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
নিহতের খবর পাওয়ার পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে নওগাঁ ও নাটোরের বিভিন্ন গ্রামের পরিবেশ।
প্রশাসনের বক্তব্য:নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সৌদি আরবের অগ্নিকাণ্ডে আত্রাই উপজেলার ১০ জনের মৃত্যুর খবর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে। মরদেহের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদের লেবার কাউন্সেলর মো. রেজা রাব্বির বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে ১৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযান এখনো চলমান রয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
লাশ দেশে ফেরানো ও সরকারি সহায়তার উদ্যোগ
অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দুর্ঘটনাস্থল ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর শোক:সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
শোকবার্তায় তিনি বলেন, জীবিকার তাগিদে সুদূর সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের এমন অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। তাদের আকস্মিক মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে শোকাহত এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
মন্ত্রী আরও জানান, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দুর্ঘটনাস্থল ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। নিহত প্রবাসীদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার শক্তি দেওয়ার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।
নোট: অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ১৩ ও ১৬ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার অভিযান ও পরিচয় শনাক্তকরণ শেষ হওয়ার পর নিহতের প্রকৃত সংখ্যা এবং পরিচয় সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যেতে পারে।



